শিরোনাম : সাহিত্য সাধক ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত
প্রবন্ধ : সাহিত্য সাধক ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত
লেখনী : কবি রীতা বসু ( প্রাক্তন দর্শনের শিক্ষিকা সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় )
খাঁটি বাঙালী সংস্কৃতি র ধারক ও বাহক শ্রীঈশ্বরচন্দ্রগুপ্ত ইংরেজীর ১৮১২ সালের ১০ই মার্চ এবং বাংলার ১২১৮ বঙ্গাব্দে র ২৫শে ফাল্গুন পশ্চিম বঙ্গের অন্তর্গত কাঁচড়াপাড়া অঞ্চলেএক সম্ভ্রান্ত বৈদ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।তাঁর পিতা হরিনারায়ণ গুপ্ত ছিলেন একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ও প্রপিতামহ নিধিরাম গুপ্ত ছিলেন বিখ্যাত কবিরাজ। মা ছিলেন শ্রীমতী দেবী।তাঁর জীবনে চরম দুঃখ নেমে আসে তাঁর দশ বছর বয়সে তাঁর মায়ের আকস্মিক প্রয়ানে।পিতা দ্বিতীয়বার বিবাহ করলে তিনি মামাবাড়ি কলকাতার জোড়াসাঁকো তে এসে থাকতে লাগলেন। মাএ ১৫ বছর বয়সে তিনি ও বিবাহ করে ন গৌরহরি মল্লিকের কন্যা দুর্গামণি দেবী ওরফে রেবাকে।
সংস্কৃত কলেজে র অধ্যাপক প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশের প্রেরনায় ও কবি বন্ধু যোগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহায্যে কবি ঈশ্বর গুপ্ত ১৮৩১ সালে "সংবাদ প্রভাকর " পএিকা র সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন।এই পএিকা টি এতদিন ছিল সাপ্তাহিক, তিনি তাকে দৈনিকপএিকা র মর্যাদা দিলেন।১৮৪৬ সালে তিনি পাষনড পএিকা র সাথে যুক্ত হন।পরবর্তী কালে তিনি "সংবাদ সাধুরঞ্জন" পএিকার সাথে যুক্ত হন।প্রায় বারো বছর তিনি বাংলার গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্রাচীন কবিয়াল দের গান ও জীবনী সংগ্রহ করে গেছে ন।
আধুনিক বাংলা র সমাজগঠনমূলক কাজে সংবাদ প্রভাকরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ।ঈশ্বরচন্দ্র প্রথমে নব্যবঙগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে রক্ষণশীল দের সমর্থক ছিলেন। তিনি হিন্দু কলেজে র শিক্ষা পদ্ধতি রও বিরোধিতা করে ছি লেন।কিন্তু নবপর্যায়ে সংবাদ প্রভাকর পএিকা র সম্পাদনাকালে তাঁর মানসিক জগতে প্রচন্ড একটা পরিবর্তন আসে ও ক্রমশ দেশের প্রগতিশীল ভাবধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন।হিন্দু থিয়োফিলানথ্রপিক এবং তত্ত্ববোধিনী সভায় তিনি বক্তৃতা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করেন।প্রথম দিকে বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের বিরোধিতা করে নানারকম ব্যঙগসূচক তির্যক মন্তব্য করে কবিতা রচনা করলেও পরবর্তী কালে নারী শিক্ষায় সমর্থন, ধর্ম সভার বিরোধিতা, দেশের বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক প্রচেষ্টা ও দরিদ্র জনগণের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন মানুষ টির উদার মনোভাব প্রমান করে।
শ্রীঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগসন্ধি র কবি হিসেবে ই পরিচিত। তিনি সমকালীন ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কবিতা রচনা করলেও তার ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কার ছিল মধ্য যুগীয়।মঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি ভারত চন্দ্রের রচনা যখন প্রায় শুকিয়ে আসছিল, তখন তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খন্ড রচনা লেখা য় উত্সাহী হন।ব্যঙগ-বিদ্রুপই ছিল তাঁর রচনা লেখা র বিশেষত্ব। এই ভঙ্গি তিনি আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন কবিয়াল দের নিকট থেকে। অনেক গুরু বিষয় ও তিনি ব্যঙগের মাধ্যমে সহজ ভাবে প্রকাশ করতে পারতেন।
স্বদেশ ও সমাজের প্রতি তাঁর আবেগ ছিল গভীর। বাংলা ভাষার জন্য যে আন্দোলন তিনি করেছেন, আজও তা স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর প্রতি টি লেখা য় তিনি ইংরেজি প্রভাব বর্জিত খাঁটি বাংলা শব্দ ব্যবহার করে গেছে ন।ভাষা ও ছন্দে র ওপর তাঁর বিস্ময় কর অধিকারের প্রমান তিনি দিয়ে গেছে ন তাঁর
"বোধেন্দুবিকাশ" নাটকে।(১৮৬৩ সাল)।
এই মহান বাঙালী র অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হল ভারতচন্দ্র রায়,রামপ্রসাদ সেন,নিধুগুপ্ত, হরু ঠাকুর এবং আরও কয়েকজন কবিয়ালের জীবনী উদ্ধার করে সেগুলো প্রকাশ করা। পরের যুগের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবনধু মিএ,রঙ্গ লাল বন্দোপাধ্যায়-এদের জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেএ তৈরি করে গেছিলেন তিনি। যদিও তাঁর কাব্য রীতি পরবর্তী কালের বাংলা সাহিত্যে আর তেমন ভাবে অনুসৃত হয়নি, তথাপি একথা অবশ্যস্বীকার্য যে,ভবিষ্যৎ বাংলা সাহিত্যের জন্য তাঁর গঠন মূলক চিন্তা ভাবনা ও আদর্শ এক অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রেখে ছে।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর চিরস্থায়ী আসনলাভ সম্ভব হয়েছিল মধ্য যুগের দেবীমাহাত্ম্য ব্যঞ্জক লেখা থেকে বাংলা কবিতা কে মুক্ত করে তিনি যেমন আনারস,পাঁঠা,তোপসে মাছ ইত্যাদি র ওপর কবিতা লিখে গেছে ন, তেমনই সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ঘটনাবলী র চিত্র রূপ আমাদের উপহার দিয়ে গেছে ন।তত্কালীন কবিয়ালদের জিম্মা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি নাগরিক বৈদগ্ধ ও সার্বিক চির আলোয় আলোকিত করে তুলেছেন আপন প্রতিভা য়।বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে "খাঁটি বাঙালী কবি " বলে অভিহিত করে ছেন।তাঁর আরও উল্লেখ যোগ্য সৃষ্টি হল,"রামপ্রসাদ সেনের কালীকীর্তন,(১৮৩৩),কবি বর ভারত চন্দ্র ও তাঁর জীবনবৃত্তান্ত (১৮৬৩)ইত্যাদি।
আমরা আজ এই মধ্যগগনে সূর্যের দ্বিশত দশ বছরের জন্ম দিনে তাঁকে প্রনাম জানাই। এক মাহেন্দ্র ক্ষণে তিনি বাংলাদেশে এসে ছিলেন, মধ্য যুগের শেষ ও আধুনিক যুগে র প্রথম পর্যায়ে। সারা জীবন বাংলা ভাষার সেবা করে গেছে ন,তাঁর মত কিছু নক্ষত্র এদেশের আকাশে ফুটেছিল বলেই আমরা বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব করতে পারি এবং পেরে যাবো,বটেই।
সমাপ্ত।
লিখন-রীতা বসু।।


Comments
Post a Comment