কবিতা : আমি জব্বারের স্ত্রী


কবিতা : আমি জব্বারের স্ত্রী

কবি  : সুজান মিঠি


আমি জব্বারের স্ত্রী।
এ ছাড়া আমার কোন নাম নেই।
আমি ভাষা শহীদের স্ত্রী,
এই আমার পরিচয়।
বাহান্ন'র রক্ত দিয়ে অক্ষর কেনার দিন রচিত
হয়েছিল আমার জীবনের নতুন অধ্যায়।
তোমরা যাকে গৌরব বলো,
অহংকার বলো,
আর আমি যাকে কান্না বলে ডাকি!
ভোর বেলা ঘুম ভেঙে উঠোন নিকিয়ে 
আমার শাশুড়ি উনুনে কাঠ গুঁজে ফোটাতেন
ভাত।
সদ্য প্রসূতি আমার কোল থেকে আমার
ছেলেকে নিয়ে তেল মাখাতেন, স্নান করাতেন।
দুলে দুলে শোনাতেন ছড়া।
আমার স্বামী ফিরে এসে বলতেন, এইতো আমার
দেশ! আমার বাংলা! আমার মা!
ওরা যে কেন উর্দুকে চায়!
বলতেন, গাও না প্রিয়া! চাঁদের গান, ফুলের গান
আলোর গান…
আমার সে সব গান বাহান্ন'র জল হাওয়ায়
সমস্ত ভেসে গেল…
আমার স্বামীর শরীর থেকে বেরিয়ে এল
গরম রক্ত…
সারা দেশ বলল, এ উষ্ণতার নাম টবীরত্ব!
এ রক্তের নাম ভালোবাসা।
আমি বললাম, এ রক্ত আমার বুকে জন্ম দিল
নতুন বিশ্বের, 
যাকে আমি দুঃখ বলে ডাকি।
আমাদের বাড়ির দাওয়ায় ইস্কুল হল।
সকাল হতে না হতেই শিশুরা কলকল করে উঠল।
আমার শাশুড়ি গেয়ে উঠলেন,
"পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।"
নদী বয়ে গেল ভাটিয়ালি সুরে সুর মিলিয়ে।
চড়াই এসে কুড়িয়ে নিতে লাগল রোদ,
খাবার আর সেই সুরের টুকরোগুলো...
তারপর আমার বোনা নকশি কাঁথায় মুড়ে 
মাটির নিচে ঘর বুনলেন পুত্রহারা আমার শাশুড়ি।
আমার পেয়ারা বাগানে কোকিল ডাকল,
বসন্ত নামল। 
স্বামীর রক্তে কেনা অক্ষরেরা
আমার মনখারাপের গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,
...ভেঙে পড়লে চলবে কেন? আমাদের স্বাধীনতা
যে বড় দরকার ছিল! এ যে বৃহত্তর সুখ!
তুমি আনন্দ গাও একখানা! 
আমি গাইলাম। বুকের ভিতর কান্নার গায়ে
হাত রাখল তারা, বলল…
আজ থেকে তোমরা বিষাদ নয়, তোমরা বিজয়ী! 
আমার শিশুরা আমার দাওয়ার ইস্কুল ছেড়ে
বিদেশ গেল। কত পড়ালেখা শিখল!
কত জীবন শিখল!
ফিরে এসে বলল, ডালের বড়ার চাইতে
অনেক বিদেশি খাবারের এখন বেশি চল।
নকশি কাঁথা, পাখির গান এসব শুধুই আবেগ!
উনিশশো বাহান্ন ছেড়ে জীবন যে অনেক দূরে এসে গেছে!
অনেক দূরে…
কিন্তু ফুলের ঠোঁটে আমি যে এখনও জব্বারের স্ত্রী!
আমি যে এখনও অক্ষর-শহীদের অর্ধাঙ্গিণী!
ওরা বলল, ছুটতে হবে বুঝলে! 
ছুটতে হলে, ভুলতে হবে!
আমার পেয়ারা বাগানে প্রখর গ্রীষ্ম নেমেছে।
এতটুকু সরসতা নেই গাছগুলোয়, কালবৈশাখীও নেই।
কেবল আমার বর্ণমালা শুকনো মুখে শুয়ে আছে।
আমার জন্য কেউ নকশি কাঁথা বানিয়ে রাখেনি।
আমার উঠোনের উনানে কাঠ জ্বেলে কেউ 
সুখ ফোটায়নি।
জীবন ছুটছে, ছুটছে শুধুই ছুটে চলেছে।
একুশ এলেই আমার স্বামীর কপালে পরানো হচ্ছে
তিলক, গলায় ঝুলছে মালা।
স্মরণ সভায় উচ্চারিত হচ্ছে …
"আ মরি বাংলা ভাষা!"
তারপর শুকনো বর্ণমালা, টেপা ঠোঁটের ফাঁকে
জ্বলন্ত সিগারেট হয়ে যাচ্ছে!
আমি জব্বারের স্ত্রী।
এখনও মাঝেমাঝে ঘুম থেকে জেগে উঠি,
হো হো করে হেসে উঠি।
শুনে দেখি, 
সব মায়েরাই তার শিশুর প্রথম কান্নার ভাষায় হাসে। 
বুকের উত্তাপে সে ভাষাকে জড়িয়ে নেয়, ভালোবাসে।
আমি জব্বারের স্ত্রী।
ভাষা শহীদের অর্ধাঙ্গিণী।
তোমরা যাকে একুশ এলেই গৌরব বলো,
আমি তাকে কান্না বলেই ডাকি।
 

Comments

Popular posts from this blog

কবিতা : দ্বীপে দ্বীপে ডারউইন

শিরোনাম : তুমি ই সেই

কবিতা : সেই স্মৃতি মনে পড়ে