প্রবন্ধ : " প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম "




         প্রবন্ধ (গবেষণা) :  " প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম"  

                    অর্ঘ মুখার্জি ( কোন্নগর )



  প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম বলতে প্রাগৈতিহাসিক মানব সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মাচরণকে বোঝায়। বিশেষত প্রাচীন প্রস্তরযুগীয় ধর্ম, মধ্য প্রস্তরযুগীয় ধর্ম, নব্য প্রস্তরযুগীয় ধর্ম ও ব্রোঞ্জ যুগীয় ধর্মকে প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম বলা হয়।

   

    •প্রাচীন প্রস্তর যুগের ধর্ম - পারলৌকিক ক্রিয়ার সামগ্রী সহ কবর দেওয়ার প্রথাই সম্ভবত প্রথম ধর্মব্যবস্থার নিদর্শন (কবর দেওয়ার প্রথা আজকের পৃথিবীতেও সর্বাধিক পরিচিত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া)। ফিলিপ লিবারম্যানের মতে, এটি “দৈনন্দিন জীবনে মৃতের পুনর্জাগরণ” ধারণার পরিচায়ক।

     অনেক পুরাতাত্ত্বিকের মতে মধ্য প্রস্তরযুগীয় সমাজে এবং নিয়ান্ডারথাল সমাজে টোটেমবাদ ও পশুপূজার কিছু প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায়। এমিল বাচলার মধ্য প্রস্তরযুগীয় গুহাগুলির পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভিত্তিতে বিশেষভাবে ওই সময়কার নিয়ান্ডারথাল ভাল্লুক পূজা সংস্কৃতির অস্তিত্বের কথা বলেছেন। আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমিতে খ্রিস্টপূর্ব ৭০,০০০ অব্দের একটি মধ্য প্রস্তরযুগীয় পশুপূজন সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে ওই পুরাক্ষেত্রের অনুসন্ধানকারীরা ওই ধরনের সংস্কৃতির কথা অস্বীকার করেছেন। ভাল্লুক পূজা জাতীয় উচ্চ প্রাচীন প্রস্তরযুগীয় পর্যায়ের পশুপূজন সংস্কৃতির উৎস সম্ভবত এই সাম্ভব্য মধ্য প্রাচীন প্রস্তরযুগীয় পশুপূজন সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত আছে।


   উচ্চ প্রাচীন প্রস্তরযুগীয় সমাজে পশুপূজার সঙ্গে মানুষের ক্রিয়াকলাপের যোগ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ভাল্লুক পূজা সংস্কৃতির যে শিল্পকর্ম ও ভাল্লুকের দেবাবশেষ-সংক্রান্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়, তার থেকে বোঝা যায়, এই অনুষ্ঠানে একটি ভাল্লুককে তীর মারা হত। তারপর তাকে হত্যা করা হত ফুসফুস লক্ষ্য করে তীর মেরে। শেষে নিহত ভাল্লুকটির চামড়ায় মোড়া একটি মাটির ভাল্লুকের মূর্তির কাছে নিহত ভাল্লুকটির মাথার খুলি ও দেহ আলাদা করে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হত।


• নব্য প্রস্তর যুগের ধর্ম - নব্য প্রস্তরযুগ ব্রোঞ্জ যুগের সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়। এই সময়কার ধর্ম সম্পর্কে কোনো সাহিত্যিক উপাদান পাওয়া যায় না। তাই নব্য প্রস্তরযুগীয় ধর্ম সম্পর্কে জানতে পুরাতত্ত্বের উপরেই নির্ভর করতে হয়।


জ্যাক কভিনের মতে, নব্য প্রস্তরযুগীয় বিপ্লব ছিল "প্রতীকী বিপ্লব" নামে চিহ্নিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার দ্বারা প্রভাবিত। তার মতে "ধর্মে"র জন্ম হয়েছিল নব্য প্রস্তরযুগে। তিনি বলেছেন, নব্য প্রস্তরযুগের মানুষের চিন্তাভাবনার একটি পরিবর্তন এসেছিল পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। এই পরিবর্তনের একাধিক স্তর দেখা যায়।এই যুগের প্রাপ্ত মূর্তিগুলি দেখিয়ে তিনি বলছেন দেবীপূজা ও ষাঁড়ের পূজার ধারণাটি এই যুগের অবদান। দর্শন ও দ্বৈতসত্ত্বার ক্রমবিবর্তনের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারণাও এযুগের অবদান।


খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দে মধ্য ইউরোপে নির্মিত সার্কুলার এনক্লোজারস নামে পরিচিত নির্মাণগুলিকে ধর্মীয় ক্রিয়াকর্মের স্থান মনে করা হয়। গসেক সার্কেলে নরবলির চিহ্ন পাওয়া যায়। এই ধরনের অনেক নির্মাণের প্রবেশপথটির সঙ্গে উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণ সংক্রান্তির সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সঙ্গে এক রেখায় নিবদ্ধ। এর থেকে বোঝা যায় সেই সময় একটি চান্দ্রসৌর পঞ্জিকা অনুসরণ করা হত। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দে ইউরোপে নির্মিত মেগালিথিক স্থাপত্যগুলির নির্মাণ শুরু হয়েছিল। সমগ্র নব্য প্রস্তরযুগ এবং ব্রোঞ্জ যুগের প্রথম দিক পর্যন্ত এই ধরনের স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল।


নারীবাদী পুরাতত্ত্বের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মারিজা গিমবুটাসের মতে, নব্য প্রস্তরযুগীয় ইউরোপে "দেবীপূজা" কেন্দ্রিক একটি "নারীকেন্দ্রিক" সমাজ গড়ে উঠেছিল। ব্রোঞ্জ যুগের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এই মাতৃতান্ত্রিক সমাজকে প্রতিস্থাপন করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে গিমবুটাসের মত আজকের যুগে বহুল সমর্থন পায় না।


• ব্রোঞ্জ যুগের ধর্ম - প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগীয় প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ধর্ম (যেটি পুনর্নির্মিত) এবং প্রমাণিত প্রাচীন সেমিটিক দেবদেবীরা ছিলেন পরবর্তী প্রাচীন প্রস্তরযুগীয় ধর্মেরই কিছু কিছু প্রথার অনুবর্তন।

 

   সৌর বজরার ছবি, বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া সৌর ক্রুশ, ব্রোঞ্জের কুঠারের ভাণ্ডার, পরবর্তীকালের কাস্তে, তথাকথিত চন্দ্র মূর্তি, বিরাট সোনার টুপি, নেব্রা আকাশ-চাকতি, টুমুলাসের কবরখানা এবং আর্নফিল্ড সংস্কৃতির শবদাহের স্থান থেকে অনুমান করা হয় ব্রোঞ্জ যুগীয় ইউরোপে ধর্মের অস্তিত্ব ছিল।

  

   • লৌহ যুগের ধর্ম - 

 

  ভূমধ্যসাগর, নিকট প্রাচ্য, ভারত ও চীনে যখন লৌহ যুগের প্রমাণ পাওয়া যায়, অধিকাংশ লৌহযুগীয় ইউরোপ (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দ থেকে অনুপ্রবেশ পর্যায় পর্যন্ত)) পড়ে প্রাগৈতিহাসিক পর্বে। হেলেনীয় ও রোমান যুগীয় জাতিবিজ্ঞান গ্রন্থগুলিতে অ-ভুমধ্যসাগরীয় ধর্মব্যবস্থাগুলির বর্ণনা কমই পাওয়া যায়।


সিথিয়ান পুরাণ (হেরোডোটাস)


কেলটিক বহুদেববাদ (পসিডোনিয়াস)


প্যালিও-বলকান পুরাণ


জার্মানিক বহুদেববাদ (ট্যাকিটাস)


স্লেভিক বহুদেববাদ (প্রোসোপিয়াস)


তুর্কি ও মোঙ্গোলিয়ান জাতির পুরাণ


মেরুদেশীয় ধর্মগুলি (সাইবেরিয়ার পশুপূজন ধর্ম, ফিনিক পুরাণ) ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান ধর্ম, আমেরিকান আদিবাসী ধর্ম ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ধর্মসমূহের ক্ষেত্রে প্রাগৈতিহাসিক যুগ শেষ হয়েছে আধুনিক যুগের প্রথম পর্ব ও ইউরোপীয় উপনিবেশের যুগে। এই ধর্মগুলির অধিকাংশই প্রথম বর্ণিত হয়েছে খ্রিস্টীয়করণের প্রেক্ষাপটে।


    ধর্মের ইতিহাস বলতে বুঝায় মানুষের ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এবং ধারনাগুলোর লিখিতরূপ, যা বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে। ধর্মীয় ইতিহাসের প্রাথমিক যুগ শুরু হয় প্রায় ৫২০০ বছর আগে (৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), যখন মানুষ লেখার পদ্ধতি আবিস্কার করে। ধর্মের পূর্ব ইতিহাসের লিখিত দলিল না থাকায় তা মানুষের বিদ্যমান ধর্মীয় বিশ্বাসের গবেষণার সাথে জড়িত। ধর্মের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তুলনামূলক ধর্মীতত্ত্ব নিয়ে যে কেউ গবেষণা করতে পারেন। ধর্মের লিখিত রূপ লেখার সময় বা অবস্থান নির্বিশেষে ধর্মীয় গ্রন্থকে সুষম মানদণ্ডে উন্নীত করতে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এর মাধ্যমে প্রার্থনা ও ধর্মীয় নিয়মগুলো এর অনুসারীরা সহজে স্মরণে রাখতে পারেন। বাইবেলের ক্ষেত্রে শতাব্দীকাল পর্যন্ত একাধিক মৌখিক গ্রন্থে সংরক্ষণ করা হয়েছিলো।


"ধর্ম" ধারণাটি ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে গঠিত হয়েছিল,যদিও বাইবেল, কুরআন এবং অন্যান্য প্রাচীন পবিত্র গ্রন্থগুলোর মধ্যেও ধর্মের ধারণা ছিল না, এমনকি এই পবিত্র গ্রন্থে লিখিত বিষয়াদি বা অনুসরকারী মানুষের সংস্কৃতিতেও না।


একবিংশ শতাব্দীতে ব্যবহৃত "ধর্ম" শব্দটির অ-ইউরোপীয় ভাষার মধ্যে পূর্ব-উপনিবেশিক অনুবাদ নেই। নৃতত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল ডুবুইসন লিখেছেন, "পশ্চিমা দেশ ও ধর্মের ইতিহাসগুলো কীভাবে তার ধর্মের অধীনে 'ধর্ম' নামে অভিহিত করেছে ... যা একেবারেই অনন্য, যা শুধুমাত্র নিজের এবং নিজের ইতিহাসের জন্য উপযুক্ত হতে পারে"।"ধর্মীয়" বিষয়ের সাথে অন্যান্য সংস্কৃতির মিথষ্ক্রিয়ার ইতিহাস, যা প্রথমত ইউরোপে খ্রিস্টানদের প্রভাবের ফলে বিকশিত হয়েছিল।


   ধর্মের ইতিহাস বিভাগ রিলিজিওনগিসিকলি শুলা নামে পরিচিত, যা একটি জার্মান মতবাদ, এটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসাবে ধর্মের নিয়মানুগ নিয়ে গবেষণা শুরু করে। এটি মানব সংস্কৃতির সাথে ধর্মকে ব্যাখ্যা করে এবং এটি আদিম বহু-ঈশ্বরবাদ থেকে নৈতিক একেশ্বরবাদ পর্যন্ত চিত্রিত করেছে।


এই মতবাদ এমন একটি সময়ে আবির্ভূত হয়েছিল যখন বাইবেল এবং গির্জার ইতিহাসের বিশদ গবেষণা জার্মানি এবং অন্যান্য জায়গায় বেড়ে উঠেছিল। ধর্মের অধ্যয়ন মানবজাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম ও অনুরূপ ধারণাগুলো প্রায়শই সভ্যতার আইন ও নৈতিক বিষয়াদি, সামাজিক কাঠামো, শিল্প ও সঙ্গীতকে প্রভাবিত করে।


    উনবিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের বিভিন্ন প্রকারের জ্ঞান এবং মানব অগ্রগতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নাটকীয় হারে বৃদ্ধি ঘটেছে। "ধর্মের ইতিহাস" এই ধর্মীয় বৈচিত্র্যের জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে সংযোগ স্থাপন করে।


সাধারণত, ধর্ম তার অগ্রগতির বিভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত থাকে। এটা হতে পারে সহজ থেকে জটিল সমাজের দিকে, বিশেষ করে বহু-ঈশ্বরবাদ থেকে একেশ্বরবাদী ধারণার দিকে ধাবিত হচ্ছে। কেউ কেউ ধর্মকে লিঙ্গাগ্রচর্মছেদন করার বিষয় নিয়ে শ্রেণিবিন্যাস করে থাকেন। কেউবা ধর্মান্তরিত (অন্যান্য ধর্মের মানুষকে নিজ ধর্মে রূপান্তরিত করার চেষ্টা) এবং অ-ধর্মান্তরিত হিসাবে শ্রেণীবিন্যাস করে থাকেন। আবার অনেক ধর্মে একই রকম কিছু সাধারণ বিশ্বাস থাকে।


উৎস - 


ধর্মীয় ধারনাগুলোর প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায় কয়েক হাজার বছর আগে মধ্য ও নিম্ন প্যালিলিথিক যুগে। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ প্রায় ৩০০,০০০ বছর আগে ধর্মীয় ধারনার প্রমাণ হিসাবে হোমো স্যাপিয়েনদের কবরস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। ধর্মীয় ধারনার অন্যান্য প্রমাণ আফ্রিকায় পাওয়া যায়, যার মধ্যে মধ্য পাথর যুগে হস্তনির্মিত বিভিন্ন প্রতীকী অন্তর্ভুক্ত। যাইহোক, প্রাথমিক প্যালিলিথিক যুগের হস্তনির্মিত বিভিন্ন প্রতীকীর ব্যাখ্যা, যা কিভাবে ধর্মীয় ধারনা সম্পর্কিত, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ কিছুটা কম বিতর্কিত। বিজ্ঞানীরা সাধারণত ধর্মীয় ধারনার প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে উর্ধ-প্যালোলিথিক (৫০,০০০-১৩,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) যুগ থেকে পাওয়া বেশ কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় ব্যাখ্যা করে থাকেন। সেই যুগের ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোর সাথে সম্পর্কিত উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে সিংহের মত দেখতে মানুষ, শুক্রের মূর্তি, চাউট গুহার সমাধি, গুহা চিত্র ইত্যাদি।


উনিশ শতকের গবেষকগণ ধর্মের উত্স সম্পর্কিত বিভিন্ন তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন, যেটি খ্রিস্টান মতবাদকে বিতর্কিত করেছিলো। উদারতার আগে দাবিগুলো চ্যালেঞ্জ করেছিল। প্রারম্ভিক তত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলর (১৮৩২-১৯১৭) এবং হার্বার্ট স্পেন্সার (১৮২০-১৯০৩) অ্যানিমিজমের ধারণা প্রস্তাব করেছিলেন। আর প্রত্নতত্ত্ববিদ জন লুবক (১৮৩৪-১৯১৩) শব্দটিকে "প্রতিমাবাদ" বলেন। এদিকে ধর্মীয় পণ্ডিত ম্যাক মুলার (১৮২৩-১৯০০) বলেন ধর্ম শুরু হয় হেডোনিজম থেকে। ফোকলোরিস্ট উইলহেলম মানহার্ড (১৯৩১-১৮৮০) বলেছিলেন, ধর্ম "প্রাকৃতিকতা" থেকে শুরু হয়েছিল, যার দ্বারা তিনি প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর পৌরাণিক ব্যাখ্যা বোঝাতে চেয়েছিলেন।এই সব তত্ত্বগুলো ব্যাপকভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। ধর্মের উৎপত্তি সংক্রান্ত কোন বিস্তৃত ঐক্যমত্য নেই।


প্রাক-মৃৎপাত্র নিওলিথিক এ (পিপিএনএ) গোবেকলি তেপে, যা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীনতম ধর্মীয় স্থান।এর মধ্যে রয়েছে বিশাল টি-আকৃতির প্রস্তর স্তম্ভ, যা বিশ্বের প্রাচীনতম মেগালিথ হিসেবে পরিচিত। এটি বিমূর্ত চিত্র, চিত্রগ্রন্থ এবং পশু ভাস্কর্য ইত্যাদি দ্বারা সজ্জিত। এটি তথাকথিত নিউলিথিক বিপ্লবের আগে নির্মিত হয়েছিল, যেমনঃ ৯০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কৃষি ও পশুপালন শুরু হয়েছিলো। কিন্তু গোবেকলি তেপের নির্মাণে একটি উন্নত সংগঠন বুঝায়, যা এখন পর্যন্ত প্যালিওলিথিক, পিপিএনএ বা পিপিএনবি সমাজগুলোর সাথে সম্পর্কিত নয়। জায়গাটি প্রথম কৃষি সমাজের শুরুতে প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায়। জায়গাটি এখনও খনন এবং বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এভাবে এই অঞ্চলের পুরনো সম্প্রদায়ের জন্য, সেইসাথে ধর্মের সাধারণ ইতিহাসের জন্য উল্লেখযোগ্য বিষয় সম্পর্কে জানা যাবে।


প্রাচীন মিশরের পিরামিড গ্রন্থ থেকে বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মীয় গ্রন্থ পাওয়া যায়, যা ২৪০০-২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লেখা হয়।


এতে সম্পূর্ণ ধর্মীয় গ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত।


মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপি হিব্রু তানখের সম্পূর্ণ গ্রন্থের প্রতিনিধিত্ব করে। এগুলো প্রায় ২০০০ বছর আগে অনুলিপি করা হয়।


সম্পূর্ণ হিব্রু গ্রন্থে, এছাড়াও তানখে,যা কিন্তু গ্রিক ভাষায় অনুদিত, (সেপ্টুয়াজিন্ট ৩০০-২০০ বিসি), প্রথম দিকে, বিশেষ করে প্রথম শতাব্দীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।


প্রাগৈতিহাসিক কাল এর বিভিন্ন ধর্ম গুলি হল - 


    পৃথিবীতে মানুষের জীবন যাপনের দিক নির্দেশনা এবং সাম্য-মৈত্রীর বাণী নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মের আগমন ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতবর্ষ হচ্ছে ধর্মের আদিভূমি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্মের নামে মানুষ রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছে আবার এই ধর্মই মানুষকে করেছে সুসংহত, মানবতাবাদী।


  • প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম - 


প্রাচীন মিশরের ধর্মীয় বিশ্বাস মিশরীয় পুরাণে প্রতিফলিত হয়েছে। তিন হাজার বছরেরও কিছু বেশি সময় ধরে মিশরে পৌরানিক ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মিশর গ্রিক শাসকদের পদানত হলেও মিশরের পৌরানিক ধর্ম টিকে থাকে। পরবর্তীতে গ্রিক শাসকদের স্থানে রোমান শাসকগন এসে মিশর অধিকার করে নেন এবং সপ্তম শতক পর্যন্ত রোমানরাই মিশর শাসন করেন, এসময়ও পৌরানিক বিশ্বাস টিকে ছিল তবে গ্রিকো-রোমান ধর্মীয় বিশ্বাসের সংস্পর্ষে এসে কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। অবশেষে ৬৪৬ সালে আরব মুসলমানদের হাতে মিশরের শাসনভার চলে গেলে পৌরানিক ধর্ম বিলুপ্তির পথ ধরে।


প্রাচীন মিশরের ইতিহাস সাধারণত প্রাচীন সাম্রাজ্য, মধ্য সাম্রাজ্য এবং নতুন সাম্রাজ্য - এই তিনটি কালে বিভক্ত করে আলোচনা করা হয়। মিশরীয় সভ্যতার তিনটি স্বর্ণযুগকে এই তিনটি কালের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। মিশরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি তার পুরাণও বিবর্তিত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই পৌরানিক চরিত্রগুলোকে যুগ ভেদে বিভিন্ন ভূমিকায় দেখা যায়।


প্রাচীন সাম্রাজ্যে মিশরীয় পুরাণের দেব-দেবীগন ছিলেন অনেকটা আঞ্চলিক, অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা চলত। সেই হিসেবে প্রাচীন সাম্রাজ্যের দেবকূলকে পাঁচটি প্রধান দলে ভাগ করা যায়।


হেলিওপোলিসের নয়জন দেব-দেবী - আতুম, গেব, আইসিস, নুট, ওসাইরিস, নেপথিস, সেত, শু এবং তেফনুত ।


হার্মোপোলিসের আটজন দেব-দেবী - নুনেত ও নু, আমুনেত ও আমুন, কুকেত ও কুক, হুহেত ও হুহ


এলিফ্যান্টাইনের খুম-সাতেত-আনুকেত ত্রয়ী


থিবিসের আমুন-মাত-খেনসু ত্রয়ী


মেম্ফিসের প'তাহ-সেকমেত-নেফেরতেম ত্রয়ী


• ইনকা সভ্যতার ধর্ম - ইনকাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসসমূহ হলো ইনকা সমাজে পালিত ধার্মিক রীতি নীতি সমূহ। ইনকাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে এ সকল বিশ্বাসসমূহের প্রভাব লক্ষ্য করা যেত। ধারণা করা হয়, ইনকাদের এসকল আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের উৎস ছিল বিভিন্ন প্রাচীন আন্দীয় সভ্যতাসমূহে পালিত ধার্মিক রীতি নীতিসমূহ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ও দৈনন্দিন জীবনে পালিত আচার-সংস্কৃৃতি ছিল ইনকাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ভিত্তি। ইনকাদের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মের মিল লক্ষ্যনীয়।


   পাশ্চাত্যের অভিযাত্রীরা ইনকাদের এই বিশ্বাসগুলোকেই ইনকা সমাজের 'ধর্ম' বলে আখ্যায়িত করে ছিল। ইনকাদের এই বিশ্বাসগুলি ছিল মূলত প্রকৃৃতিবাদ এবং বহু-ঈশ্বরবাদ। স্পেনীয় আক্রমণের পরে ধীরে ধীরে খ্রিস্ট ধর্ম এর প্রভাবে ইনকা বিশ্বাস বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে এখনো আন্দিজ অঞ্চলের আদিবাসীদের সংস্কৃৃতির মধ্যে এধরনের বিশ্বাসের আংশিক বেঁচে আছে।


     ইনকারা তিনটি জগতের প্রতি বিশ্বাস করতো। ইনকারা মনে করতো তাদের দেব-দেবী, সাপা (সম্রাট) ও সকল জীব এই তিনটি জগতের কোনো না কোনোটিতে থাকতো। কেচুয়া ভাষায় এই জগৎগুলোকে বলা হতো "পাচা" (Pacha)।


তিনটি জগৎ হলো-


স্বর্গ বা হানান পাচা


নরক বা উখু পাচা


পৃথিবী বা কাই পাচা


• আর্য ধর্ম - 


বর্তমানে ইরান থেকে আগত আর্যজাতি ভারতবর্ষে আসার পর, তথ্যে পরিপূর্ণ যে মতবাদ প্রচার করে তাই মূলত আর্য ধর্ম। আর্যরা সনাতনী হিন্দু হিসেবেও পরিচিত। সনাতনীদের মূল ধর্ম গ্রন্থ বেদ। এ ধর্মও একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। আর্যরা কখনও করো উপর সাম্রাজ্যবাদী মতবাদ প্রকাশের চেষ্টা করেনি। যখন কেউ শল্য-চিকিৎসা বা অপারেশনের কথা চিন্তাও করতে পারতো না,তখন ভারতীয় মহাবৈদ্য শুশ্রোত তার শুশ্রোত-সংহিতায় শল্য-চিকিৎসার কথা বলাছিলেন। আর্যরা বিজ্ঞানমুখী চিন্তাপ্রকাশের জন্য ৪০০০ থেকে ৫০০০ বছর ধরে বিখ্যাত। তবে আর্যদের রয়েছে সমাজ বিধ্বংসী জাতিভেদ প্রথা। আর্যরা সকল মতবাদকে সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।


 • সামারিতান - 


সামারিতান হচ্ছে বর্তমান ইসরাইলের উত্তর প্রদেশে বসবাসকারী সেমেটিক সম্প্রদায়ের একটি সাম্প্রদায়িক শাখাবিশেষ। এ মতবাদটির ইহুদিবাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিল রয়েছে। এটি বাইবেলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা আধুনিক মতবাদ।


 • প্রাচীন গ্রিক ধর্ম -


সবচেয়ে প্রাচীন ও শৈল্পিক ধর্ম হিসাবে ইউরোপে গ্রিক মিথ চালু ছিল । এ ধর্মের বিষয়বস্তু বর্তমানে রূপকথার গল্প হয়ে দাড়িয়েছে। বর্তমানে এর অনুসারী নেই বললেই চলে। গ্রিকদের লক্ষাধিক দেব-দেবী বিদ্যমান । তবে ধর্মটির প্রধান দেবতা হিসাবে জিউসকে ধরা হয়।


• কনফুসীয় ধর্ম - (সরলীকৃত চীনা: 儒学; প্রথাগত চীনা: 儒學; ফিনিন: Rúxué) চীনের একটি নৈতিক ও দার্শনিক বিশ্বাস ও ব্যবস্থা যা বিখ্যাত চৈনিক সাধু কনফুসিয়াসের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ কনফুসিয়াস হলেন কনফুসীয় ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। এটি মূলত নৈতিকতা, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিন্তাধারাসমূহের সম্মিলনে সৃষ্ট একটি জটিল ব্যবস্থা যা একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতি ও ইতিহাসে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। অনেকের মতে এটি পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে স্বীকৃত হতে পারে। কারণ এই দেশগুলোতে এখন কনফুসীয় আদর্শের বাস্তবায়নের উপর বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। কনফুসিয় মতবাদ একটি নৈতিক বিশ্বাস এএটাকে ধর্ম বলা হবে কিনা এই নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মাঝে মতভেদ আছে।অনেক শিক্ষাবিদ কনফুসিয় মতবাদকে ধর্ম নয় বরং দর্শন হিসেবে মেনে নিয়েছেন।কনফুসিয় ধর্মের মূলকথা হচ্ছে মানবতাবাদ।

 

• শিন্তো ধর্ম - 


   শিন্তো ধর্ম জাপান ভূমিতে প্রচলিত একটি ধর্ম ।এটাকে আচার ধর্ম বলা হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রথা এবং আচারের মাধ্যমে এই ধর্ম পালিত হয় যা বর্তমান এবং অতীতের মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করেছে। জাপানী পুরাণ খ্রিস্টের জন্মের ৬৬০ বছর পূর্বে শিন্তো ধর্ম উৎপত্তি লাভ করেখ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে কোজিকি এবং নিহন শকি'র ঐতিহাসিক দলিলে শিন্তো আচারের কথা লিপিবদ্ধ আছে।


শিন্তো শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দেবতার পথ। শিন্তো শব্দটি শিন্দো শব্দ থেকে এসেছে। শিন্ডো শব্দটির মূল খুঁজে পাওয়া যায় চীনা শব্দ শেন্ডো থেকে। শিন্তো শব্দটি দুটি শব্দ নিয়ে গঠিত। শিন অর্থ ইংরেজি স্পিরিট বা আধ্যাত্বিক শক্তি এবং তো অর্থ পথ।


শিন্তো জাপানের প্রধান ধর্ম। দেশটির ৮০% মানুষ বিভিন্ন ভাবে শিন্তো রীতিনীতি পালন করে কিন্তু জরীপে খুব অল্প সংখ্যক লোক নিজেদেরকে শিন্তো ধর্মানুসারী বলে পরিচয় দেয়।


• তাওবাদ -



 তাওবাদ বা দাওবাদ চীনের একটি প্রাচীন ধর্মমত। প্রাচীন দার্শনিক কনফুসিয়াসের সমসাময়িক লাও জে এই তাও মতবাদ প্রচার করেন। তার মতবাদ কনফুসিয়াসের মতো জীবনবাদী ছিল না। তাকে আধ্যাত্মবাদী বা প্রকৃতিবাদী বলা চলে। চীনা জীবনধারায় এই মতবাদ এখনও বৌদ্ধ ও কনফুসীয়বাদের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে আছে। তাও শব্দের অর্থ পথ।



 • ক্যাও দাই = 


   'ক্যাওদাই বা ক্যাও দাই মতবাদ (ভিয়েত্নামিজ: Đạo Cao Đài 道高臺, "মহা শক্তির পথ"; চীনা: 高台教; ফিনিন: Gāotáijiào) হচ্ছে একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম। ১৯২৬ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের তায় নিনহ শহরে এই ধর্মের আবির্ভাব হয়।এই ধর্মের পুরো নাম হচ্ছে দাই দাও তাম কাই ফো দো("The Great Faith [for the] Third Universal Redemption").ক্যাও দাই, আক্ষরিক অর্থে সর্বোচ্চ শাসক অথবা সর্বোচ্চ শক্তি হচ্ছেন উপাস্য দেবতা, যিনি এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যাকে ক্যাও দাই অনুসারীরা উপাসনা করে। ক্যাও দাই অনুসারীরা পৃথিবী স্রষ্টাকে সংক্ষেপে দুক ক্যাও দাই বলে যার পুরো নাম ক্যাও দাই তিয়েন অং দাই বো তাত মা হা তাত। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত ক্যাও দাই উপাসনালয়গুলো দেখতে একই রকম। আকৃতি এবং রঙের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।


    এই ভাবে গুহাবাসী মানুষ নিজেদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকে কল্পনার রঙে জারিত করে তৈরি করল ধর্মবিশ্বাস।যা প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত তাকে সঙ্গ দিয়ে এসেছে।


গ্রন্থ ঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার


• উইকিপিডিয়া

• আনন্দবাজার অনলাইন পত্রিকা

• History of art - Parragon 

• দেবতার সন্ধানে - একটি অনার্য অডিসি - শিবাংশু দে

• লোকসংস্কৃতির দিগ দিগন্ত - চূড়ামণি হাটি

• Visual Encyclopedia - Pentagon Press 

• কৃতজ্ঞতা জানাই বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক শ্রী সামসুজ জামান মহাশয় কে যিনি প্রতিনিয়ত আমাকে লেখার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

কবিতা : দ্বীপে দ্বীপে ডারউইন

শিরোনাম : তুমি ই সেই

কবিতা : সেই স্মৃতি মনে পড়ে